দৈনিক তরুন আলো

*সীমিত আসন, সীমাহীন অভিজ্ঞতা: বুটেক্সের হল জীবন*



*সীমিত আসন, সীমাহীন অভিজ্ঞতা: বুটেক্সের হল জীবন*

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের হলে থাকার অভিজ্ঞতার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনাই হয় না। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যদি হয় ছাত্রজীবন, তাহলে ছাত্রজীবনের স্বর্ণালী দিনগুলো হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবন। পরিবার ছেড়ে নতুন পরিবেশে, নতুন মানুষদের সঙ্গে শুরু হয় এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা, যা ধীরে ধীরে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) মোট চারটি আবাসিক হল রয়েছে। ছেলেদের জন্য শহীদ আজিজ হল, এম এ জি ওসমানী হল এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম হল; আর মেয়েদের জন্য রয়েছে বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হল। এই চারটি হলে সহস্রেরও কম সংখ্যক শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধা দিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়টি। 

আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রথম বর্ষে নবীন শিক্ষার্থীদের হল জীবন শুরু হয় গণরুমের মধ্য দিয়ে। এই গণরুমে থাকার অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্যরকম। এখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ফ্লোরিং করে থাকতে হয়। তাদের জন্য থাকে মাত্র একটি বা দুটি ওয়াশরুম। ফলে সকাল ৮টার ক্লাস ধরতে হলে ওয়াশরুমের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়।

এমনটাই জানাচ্ছিলেন গর্বিতা সাহা মুদ্রা, বুটেক্সের বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, “আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় ছোট থেকে একাই বড়ো হয়েছি। তাই প্রথম বর্ষে গনরুমে এতগুলো মানুষের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারব কিনা, তা নিয়ে অনেক চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু ৯ জন ৯ জেলার ৯ রকমের মানুষ হয়েও আমরা সবাই মিলে একসময় একটি পরিবারে পরিণত হই। হাসি-ঠাট্টা, গল্প, রাত জেগে গান গাওয়া ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সবাই মিলে চা, কফি, নুডলস বানিয়ে খেতাম। সেই দিনগুলো আসলে কখনোই ভোলার মতো না।” 

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান বুটেক্সের শহিদ আজিজ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. মুরতাদা রাব্বি। জানুয়ারি মাসে গণরুমে ওঠা এই প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী বলেন, “গণরুমে সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই থাকলেও আমরা এটাকে নিজেদের মতো করে উপভোগ করি। গণরুমের মুড়ি পার্টির কথা না বললেই নয়। সেখানে আমরা সবাই একসঙ্গে বসে ঝালমুড়ি খাই।”

দ্বিতীয় বর্ষে থেকে আবাসিক শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে নিজস্ব রুম পেতে শুরু করেন। বুটেক্সের হলগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন ইনডোর ও আউটডোর কার্যক্রমের সুযোগ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে শিক্ষার্থীরা ক্যারাম বোর্ড, টেবিল টেনিস, ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো খেলায় মেতে ওঠেন। বিশ্বকাপ বা কোনো দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের সময় হলের টিভি রুমে ভিড় জমে যায়, সবাই একসঙ্গে নিজেদের প্রিয় দলকে সমর্থন করেন। রমজান মাসে ইফতারের সময় প্রতিটি রুম যেন একটি পরিবারের রূপ নেয়; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে আজানের অপেক্ষায় থাকে।

প্রতিদিন সকাল বাড়ার সাথে সাথে মুখোরিত হতে শুরু করে ক্যাম্পাস আর ব্যাস্তানুপাতিক হারে ফাঁকা হতে থাকে এক একটি হল। টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার সময় আবাসিক শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে প্রস্তুতি নেন, রাত জেগে পড়াশোনা চলে রিডিং রুমে। যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলনে তারা একসঙ্গে রাস্তায় নেমে আসেন, আর তাদের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাকিব আল হাসান তার এক বছরের হল জীবনের বর্ণনা করছিলেন এভাবে, “আমার মতে, স্টুডেন্ট জীবনে হল এক ধরনের আশীর্বাদ। বাড়ি থেকে দূরে ঢাকার মতো বড়ো শহরে থাকার প্রয়োজন হলে হলের মতো নিরাপদ জায়গা আর নেই। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি, ডাইনিং ও ক্যান্টিন সুবিধা, বিশাল মাঠ, মসজিদ এবং ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা সব মিলিয়ে অভিযোগের তেমন সুযোগ নেই। পরিবারের বাইরে থাকার যে সূক্ষ্ম বেদনা, হল জীবন সেটাও অনেকটা ভুলিয়ে দেয়। খেলাধুলা, উৎসব সবকিছু সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়ার কারণে একাকিত্ব অনুভব করার সুযোগই থাকে না।”

বুটেক্সের আবাসিক হলগুলোতে সবচেয়ে বড়ো আয়োজন হল ফিস্ট। হল ফিস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো বর্ণিল আলোকসজ্জায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ইনডোর ও আউটডোর গেম, পুরস্কার বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর অন্যতম আকর্ষণ। এ আয়োজনে পিছিয়ে থাকে না খাবারের মেন্যু। এই ভোজ ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে ঘিরে আবাসিক শিক্ষার্থীরা আনন্দে মেতে ওঠেন।

গর্বিতা সাহা মুদ্রা, বুটেক্সের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। প্রথম বর্ষে গণরুমে ওঠা এই শিক্ষার্থী বর্তমানে চারজনের রুমে থাকেন। গত ৯ এপ্রিল ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে তার স্নাতক সম্পন্ন হয়েছে। এখন তাকে বিদায় নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ছেড়ে যেতে হবে হল। শেষ হয়ে যাবে তার হল জীবনের অধ্যায়। পেছনে পড়ে থাকবে ভুলতে না পারা হাজার হাজার স্মৃতি। তিনি বলেন, “ধীরে ধীরে এই অচেনা জায়গাটা আমার সেকেন্ড হোম হয়ে গেছে। রুমমেটরা আরেকটা পরিবারের মতো হয়ে উঠেছে। খুব মিস করব এই জীবনটা। আর বেশিদিন নেই হলের মেয়াদ এটা ভাবলেই বুকটা ভারী হয়ে ওঠে।”

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক তরুন আলো

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬


*সীমিত আসন, সীমাহীন অভিজ্ঞতা: বুটেক্সের হল জীবন*

প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image




বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের হলে থাকার অভিজ্ঞতার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনাই হয় না। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যদি হয় ছাত্রজীবন, তাহলে ছাত্রজীবনের স্বর্ণালী দিনগুলো হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবন। পরিবার ছেড়ে নতুন পরিবেশে, নতুন মানুষদের সঙ্গে শুরু হয় এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা, যা ধীরে ধীরে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।


বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) মোট চারটি আবাসিক হল রয়েছে। ছেলেদের জন্য শহীদ আজিজ হল, এম এ জি ওসমানী হল এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম হল; আর মেয়েদের জন্য রয়েছে বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হল। এই চারটি হলে সহস্রেরও কম সংখ্যক শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধা দিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়টি। 


আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রথম বর্ষে নবীন শিক্ষার্থীদের হল জীবন শুরু হয় গণরুমের মধ্য দিয়ে। এই গণরুমে থাকার অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্যরকম। এখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ফ্লোরিং করে থাকতে হয়। তাদের জন্য থাকে মাত্র একটি বা দুটি ওয়াশরুম। ফলে সকাল ৮টার ক্লাস ধরতে হলে ওয়াশরুমের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়।


এমনটাই জানাচ্ছিলেন গর্বিতা সাহা মুদ্রা, বুটেক্সের বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, “আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় ছোট থেকে একাই বড়ো হয়েছি। তাই প্রথম বর্ষে গনরুমে এতগুলো মানুষের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারব কিনা, তা নিয়ে অনেক চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু ৯ জন ৯ জেলার ৯ রকমের মানুষ হয়েও আমরা সবাই মিলে একসময় একটি পরিবারে পরিণত হই। হাসি-ঠাট্টা, গল্প, রাত জেগে গান গাওয়া ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সবাই মিলে চা, কফি, নুডলস বানিয়ে খেতাম। সেই দিনগুলো আসলে কখনোই ভোলার মতো না।” 


একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান বুটেক্সের শহিদ আজিজ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. মুরতাদা রাব্বি। জানুয়ারি মাসে গণরুমে ওঠা এই প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী বলেন, “গণরুমে সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই থাকলেও আমরা এটাকে নিজেদের মতো করে উপভোগ করি। গণরুমের মুড়ি পার্টির কথা না বললেই নয়। সেখানে আমরা সবাই একসঙ্গে বসে ঝালমুড়ি খাই।”


দ্বিতীয় বর্ষে থেকে আবাসিক শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে নিজস্ব রুম পেতে শুরু করেন। বুটেক্সের হলগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন ইনডোর ও আউটডোর কার্যক্রমের সুযোগ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে শিক্ষার্থীরা ক্যারাম বোর্ড, টেবিল টেনিস, ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো খেলায় মেতে ওঠেন। বিশ্বকাপ বা কোনো দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের সময় হলের টিভি রুমে ভিড় জমে যায়, সবাই একসঙ্গে নিজেদের প্রিয় দলকে সমর্থন করেন। রমজান মাসে ইফতারের সময় প্রতিটি রুম যেন একটি পরিবারের রূপ নেয়; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে আজানের অপেক্ষায় থাকে।


প্রতিদিন সকাল বাড়ার সাথে সাথে মুখোরিত হতে শুরু করে ক্যাম্পাস আর ব্যাস্তানুপাতিক হারে ফাঁকা হতে থাকে এক একটি হল। টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার সময় আবাসিক শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে প্রস্তুতি নেন, রাত জেগে পড়াশোনা চলে রিডিং রুমে। যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলনে তারা একসঙ্গে রাস্তায় নেমে আসেন, আর তাদের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ।


সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাকিব আল হাসান তার এক বছরের হল জীবনের বর্ণনা করছিলেন এভাবে, “আমার মতে, স্টুডেন্ট জীবনে হল এক ধরনের আশীর্বাদ। বাড়ি থেকে দূরে ঢাকার মতো বড়ো শহরে থাকার প্রয়োজন হলে হলের মতো নিরাপদ জায়গা আর নেই। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি, ডাইনিং ও ক্যান্টিন সুবিধা, বিশাল মাঠ, মসজিদ এবং ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা সব মিলিয়ে অভিযোগের তেমন সুযোগ নেই। পরিবারের বাইরে থাকার যে সূক্ষ্ম বেদনা, হল জীবন সেটাও অনেকটা ভুলিয়ে দেয়। খেলাধুলা, উৎসব সবকিছু সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়ার কারণে একাকিত্ব অনুভব করার সুযোগই থাকে না।”


বুটেক্সের আবাসিক হলগুলোতে সবচেয়ে বড়ো আয়োজন হল ফিস্ট। হল ফিস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো বর্ণিল আলোকসজ্জায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ইনডোর ও আউটডোর গেম, পুরস্কার বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর অন্যতম আকর্ষণ। এ আয়োজনে পিছিয়ে থাকে না খাবারের মেন্যু। এই ভোজ ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে ঘিরে আবাসিক শিক্ষার্থীরা আনন্দে মেতে ওঠেন।


গর্বিতা সাহা মুদ্রা, বুটেক্সের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। প্রথম বর্ষে গণরুমে ওঠা এই শিক্ষার্থী বর্তমানে চারজনের রুমে থাকেন। গত ৯ এপ্রিল ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে তার স্নাতক সম্পন্ন হয়েছে। এখন তাকে বিদায় নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ছেড়ে যেতে হবে হল। শেষ হয়ে যাবে তার হল জীবনের অধ্যায়। পেছনে পড়ে থাকবে ভুলতে না পারা হাজার হাজার স্মৃতি। তিনি বলেন, “ধীরে ধীরে এই অচেনা জায়গাটা আমার সেকেন্ড হোম হয়ে গেছে। রুমমেটরা আরেকটা পরিবারের মতো হয়ে উঠেছে। খুব মিস করব এই জীবনটা। আর বেশিদিন নেই হলের মেয়াদ এটা ভাবলেই বুকটা ভারী হয়ে ওঠে।”


দৈনিক তরুন আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: এমডি সিফাত হোসাইন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক তরুন আলো