গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারের অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ আশ্রয়ণ প্রকল্প। কিন্তু পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় এ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ঘর বিক্রি, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত রাখা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত উপকারভোগীদের পরিবর্তে প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের ঘর বরাদ্দ দেওয়ায় অনেকেই পরে ঘর বিক্রি করে দিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মোট ১০১টি আশ্রয়ণ ঘর নির্মাণ করা হয়। এসব ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার টাকা। উপজেলার ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের চর-ভাঙ্গুড়ায় ৪১টি, চর-ভাঙ্গুড়া পূর্বপাড়ায় ২১টি, অষ্টমনিষা ইউনিয়নের লামকান গ্রামে ৭টি, মণ্ডতোষ ইউনিয়নের টুনিপাড়ায় ৪টি, দিলপাশার ইউনিয়নের বেতুয়ান গ্রামে ৫টি, পার-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নে ৩টি, খানমরিচ ইউনিয়নে ৫টি এবং ভাঙ্গুড়া পৌরসভায় ১৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নির্মিত ১০১টি ঘরের মধ্যে অন্তত ৩৫টি ঘর ৮০ হাজার টাকা থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে এসব ঘরের অনেকগুলোতেই বসবাস করছেন নতুন মালিক কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চর-ভাঙ্গুড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৬৪ নম্বর ঘরের জাহানারা, ৬৫ নম্বর ঘরের আনেছা খাতুন, ৬৬ নম্বর ঘরের রতনের মা, ৯৩ নম্বর ঘরের হোসেন চাঁদ, ৯৫ নম্বর ঘরের মজনুর প্রামাণিক, ৭০ নম্বর ঘরের সোহাগ হোসেন, ৭৭ নম্বর ঘরের জোহরা খাতুন, ১৭ নম্বর ঘরের আনোয়ারা খাতুন, ১৫ নম্বর ঘরের হাসি খাতুন, সবুরা খাতুনসহ অন্তত ৩৫ জন উপকারভোগী তাদের বরাদ্দকৃত ঘর বিক্রি করেছেন। প্রতিটি ঘর ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকৃত গৃহহীন ও ভূমিহীনদের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে অনেক সচ্ছল ব্যক্তিকেও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ফলে তারা পরবর্তীতে ঘর বিক্রি করে অন্যত্র চলে যান।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রকল্পের প্রায় ২৫টি ঘর দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে এমন একাধিক ঘর দেখা গেছে, যেখানে নিয়মিত বসবাসের কোনো চিহ্ন নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত এসব ঘরে নিয়মিত জুয়া খেলা, মাদক সেবন এবং রাতের আঁধারে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। এতে এলাকার সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফেরদৌস আলম বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে।”
ঘর বিক্রি, পরিত্যক্ত থাকা এবং অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে ভাঙ্গুড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বলেন, “অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা এর সুফল পান।
ছবির ক্যাপশন:
ভাঙ্গুড়ার চর-ভাঙ্গুড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের একাংশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের বেশ কয়েকটি ঘর বিক্রি ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারের অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ আশ্রয়ণ প্রকল্প। কিন্তু পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় এ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ঘর বিক্রি, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত রাখা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত উপকারভোগীদের পরিবর্তে প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের ঘর বরাদ্দ দেওয়ায় অনেকেই পরে ঘর বিক্রি করে দিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মোট ১০১টি আশ্রয়ণ ঘর নির্মাণ করা হয়। এসব ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার টাকা। উপজেলার ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের চর-ভাঙ্গুড়ায় ৪১টি, চর-ভাঙ্গুড়া পূর্বপাড়ায় ২১টি, অষ্টমনিষা ইউনিয়নের লামকান গ্রামে ৭টি, মণ্ডতোষ ইউনিয়নের টুনিপাড়ায় ৪টি, দিলপাশার ইউনিয়নের বেতুয়ান গ্রামে ৫টি, পার-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নে ৩টি, খানমরিচ ইউনিয়নে ৫টি এবং ভাঙ্গুড়া পৌরসভায় ১৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নির্মিত ১০১টি ঘরের মধ্যে অন্তত ৩৫টি ঘর ৮০ হাজার টাকা থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে এসব ঘরের অনেকগুলোতেই বসবাস করছেন নতুন মালিক কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চর-ভাঙ্গুড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৬৪ নম্বর ঘরের জাহানারা, ৬৫ নম্বর ঘরের আনেছা খাতুন, ৬৬ নম্বর ঘরের রতনের মা, ৯৩ নম্বর ঘরের হোসেন চাঁদ, ৯৫ নম্বর ঘরের মজনুর প্রামাণিক, ৭০ নম্বর ঘরের সোহাগ হোসেন, ৭৭ নম্বর ঘরের জোহরা খাতুন, ১৭ নম্বর ঘরের আনোয়ারা খাতুন, ১৫ নম্বর ঘরের হাসি খাতুন, সবুরা খাতুনসহ অন্তত ৩৫ জন উপকারভোগী তাদের বরাদ্দকৃত ঘর বিক্রি করেছেন। প্রতিটি ঘর ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকৃত গৃহহীন ও ভূমিহীনদের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে অনেক সচ্ছল ব্যক্তিকেও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ফলে তারা পরবর্তীতে ঘর বিক্রি করে অন্যত্র চলে যান।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রকল্পের প্রায় ২৫টি ঘর দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে এমন একাধিক ঘর দেখা গেছে, যেখানে নিয়মিত বসবাসের কোনো চিহ্ন নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত এসব ঘরে নিয়মিত জুয়া খেলা, মাদক সেবন এবং রাতের আঁধারে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। এতে এলাকার সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফেরদৌস আলম বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে।”
ঘর বিক্রি, পরিত্যক্ত থাকা এবং অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে ভাঙ্গুড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বলেন, “অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা এর সুফল পান।
ছবির ক্যাপশন:
ভাঙ্গুড়ার চর-ভাঙ্গুড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের একাংশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের বেশ কয়েকটি ঘর বিক্রি ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন